হত্যাসহ ২১ মামলার আসামি ইয়াছিন মিয়া। ‘ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান’ হয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে। ইয়াছিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন এখন রোকন উদ্দিন।
তাঁর বিরুদ্ধেও রয়েছে হত্যাসহ ২৮ মামলা। এই দুজনের সহযোগী কাজী মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ২৭টি ও নুরু ভান্ডারীর বিরুদ্ধে রয়েছে ১৭টি মামলা। সহযোগী সাদেক ও গফুরের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে ৯টি করে।
দাগি এসব আসামিকে ধরতে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, ৩টি ডগ স্কোয়াড ও ১২টি ড্রোন নিয়ে পাঁচটি বাহিনীর ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য নিয়ে গত সোমবার দিনভর অভিযান চালানো হলেও চার কারণে সর্ববৃহৎ এক অভিযান হয়েছে ব্যর্থ।
অভিযানে এসব সন্ত্রাসীর কেউ ধরা পড়েনি। ধরা যায়নি র্যাবের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব হত্যার এজাহারনামীয় ২৯ আসামির একজনকেও। মেলেনি অস্ত্র ভান্ডারের সন্ধান।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে ৭ দশমিক ৬২ বুলেট ও মিয়ানমারে ব্যবহার করা হয় এমন গুলি থাকার প্রমাণ রয়েছে। কিছু উদ্ধারও হয়েছে। এই জায়গায় অত্যাধুনিক অস্ত্রের এসব বুলেট কারা এনেছে, কারা এটি ব্যবহার করছে সেটি বিস্ময়কর। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলেও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।’ তাহলে অভিযানের খবর কি আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল? এমন প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘এত বড় অভিযান পরিচালনা করতে গেলে কিছু দুর্বলতা তো থাকে। এখন এমন এক যুগ, যেখানে সামান্য মুভমেন্টও ফাঁস হয়ে যায়।’
অভিযানে অর্জন
যৌথ বাহিনীর এই অভিযানে সেনাবাহিনীর ৫০০ সদস্য, জেলা পুলিশের ১৫০ সদস্য, মেট্রোপলিটন পুলিশের ৮০০ সদস্য, রেঞ্জ রিজার্ভ থেকে ৪০০ সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ১৫০ সদস্য, র্যাবের ৪০০ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বমোট ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য অংশ নেন অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের কেউ দাগি সন্ত্রাসী নয়। তাদের কারওর বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা রয়েছে কিনা সেটিও জানে না পুলিশ। অভিযানে ৭ দশমিক ৬২ বুলেট এবং মিয়ানমারে ব্যবহার করা হয় এমন অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। যে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তার মধ্যে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় পিস্তল ও একটি এলজি।
যে কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে সন্ত্রাসীরা
যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তার আশ্রয়ে যায় জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা। এজন্য প্রশাসন চাইলেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারে না। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়; তাদের আবার দ্রুত জামিনের ব্যবস্থা করা হয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। সে কারণে গত ২০ বছর ধরে জঙ্গল সলিমপুরে শক্ত কোনো অবস্থা তৈরি করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিন মিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল তখনকার এমপি এস এম আল মামুনের সঙ্গে। এখন বিএনপির সঙ্গেও দহরম মহরম সম্পর্ক বলে প্রচার আছে।
অন্যদিকে, রোকন উদ্দিন এখন উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আগে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি গাজী সাদেকুর রহমান, সেক্রেটারি কাজী মশিউর রহমান ও সলিমপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য গোলাম গফুরের। আলীনগর সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণ ছিল সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাকিম, সেক্রেটারি মো. ইয়াসীন ও তাঁর ভাই মো. ফারুকের। স্থানীয়রা কেউ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতেন না। ভুক্তভোগী একাধিক বাসিন্দা জানান, তারা এখন রোকন ও ইয়াছিনের সহযোগী হয়ে এলাকায় আছেন। রোকন ও ইয়াসিনের কথা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না জঙ্গল সলিমপুরের ৩৭ পাহাড়ে। এই নিয়ন্ত্রণ ঘিরে লাশ পড়ছে একের পর এক।
২০ মাসে ৬ খুন
২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর পাহাড়ি এলাকা দখল করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় রোকন বাহিনী। এতে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও সংঘর্ষে রোকন বাহিনীর মাঈন উদ্দিন ও ইয়াছিন বাহিনীর খলিলুর রহমান কানু খুন হন। এছাড়া সলিমপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি মীর আরমানকে একই দলের লোকেরা ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি ঘর থেকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করে ডান পায়ের রগ কাটার পর ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে হত্যা করে। এলাকায় অধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার বলে পরিবারের দাবি। অপরদিকে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মোহাম্মদ মাসুদ নামে বিএনপির এক নেতা খুন হন। জঙ্গল ছলিমপুর ৫ নম্বর ছিন্নমূল এলাকায় ইট, বালু, কংক্রিটের ব্যবসা করতেন তিনি। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি অভিযান চালাতে এসে এখানে খুন হন র্যাবের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব। একটি খুনেরও বিচার পায়নি ভুক্তভোগীদের পরিবার।
গ্রেপ্তার হয়নি র্যাব সদস্য হত্যা মামলার আসামিরা
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, র্যাবের ডিএডি হত্যা মামলায় অভিযানের আগে ১৩ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে এজাহারনামীয় ২৯ আসামির মধ্যে ৫ জনকে আটক করে র্যাব থানায় হস্তান্তর করেছে। তারা হলেন–ইউনুছ, জাহিদ, আরিফ, মিজান ও মামুন। এখনও গ্রেপ্তার হননি এই মামলার এজাহারে নাম থাকা মুহাম্মদ ইয়াছিন প্রকাশ দস্যু শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন, নুরুল হক ভান্ডারী, কালা ইয়াসিন প্রকাশ জামাই ইয়াছিন প্রকাশ ক্যাডার ইয়াছিন, শাহেদ আলী, মেজবাহ. মো. হাছান, মো. শাহিন, খলিলুর রহমান, মুহাম্মদ ওমর ফারুক, মো. মোরশেদ, মো. নূর হোসেন, কাজী ফারুক প্রকাশ কালা ফারুক, সালাউদ্দিন, মো. শুকুর, কালা বাচ্চু, মো. ফয়সাল, সাগর, আলম, বেলাল, সাইফুল, সুলতান, মো. নাহিদ ইসলাম, মো. শাহ আলম প্রকাশ টুটুল ও মো. পারভেজ।
ভিডিও বার্তায় যা বলেছিলেন ইয়াছিন ও রোকন
এখন পলাতক থাকলেও কিছুদিন আগে ভিডিও বার্তা দিয়ে ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন বলেন, ‘এখানে যত সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সবই রোকন মেম্বারের লোকজনের মাধ্যমে। ডিসি পার্ক থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় তার লোকেরা চাঁদাবাজি করছে। তার কাছে সব অস্ত্রের ভান্ডার। এই রোকন মেম্বারকে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’ অন্যদিকে, সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন নিজেকে সলিমপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ড বাসিন্দা দাবি করে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে ভূমিদস্যু (ইয়াছিনকে উদ্দেশ করে) যে আছে সে সবসময় একটি প্রতিপক্ষ রাখে। ওই প্রতিপক্ষ দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করিয়ে থাকে। নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে। প্রশাসন সব কিছু জানে।’
যে কারণে পালাতে পেরেছে দাগি আসামিরা
জঙ্গল সলিমপুরের এক ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন যে এখানে বড় ধরনের অভিযান চালাবে তা দুই দিন আগে থেকেই জানি আমরা। যারা এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের কাছে এমন খবর আগে পৌঁছে যাওয়ায় অভিযান শুরুর আগের রাতেই রাস্তার কালভার্ট ভেঙে দেয় তারা। বাইরে থেকে ট্রাক এনে রাখে সড়কের ওপর। এজন্য অভিযানে এসে আর তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।’ আলীনগরের বাসিন্দা নুর উদ্দিন বলেন, ‘প্রশাসনের লোক এলে যাতে কারও বিরুদ্ধে কিছু না বলি তা দু’দিন আগেই বলে যায় বাহিনীর লোকেরা। শুনেছি বাহিনীর নেতারা কেউ বোরকা পরে আগেভাগে পালিয়েছে। আবার কেউ দূরের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘ ২০ বছর পুলিশের কোনো কমান্ড ছিল না। তবে সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেই কমান্ড প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি আমরা। এখন নিয়মিত চেক পোস্ট থাকবে, টহল টিমও যাবে সেখানে।’