ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সোমবার তারা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনের সমর্থকেরা।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনার মধ্যে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
মিছিলের সময় বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং প্ল্যাকার্ড বহন করেন। ২৮ বছর বয়সি এক বিক্ষোভকারী অভয় আরিয়ান বলেন, ‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কত বড় জনসমাগম হয়েছে। সরকারকে জনগণের কথা শুনতে হবে।’ সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার ব্যাপক সংশোধনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত বছর শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদ গেছে। সমালোচকদের দাবি, এ পদক্ষেপে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মুসলিমরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন এবং ভুয়া এন্ট্রি বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই সংশোধন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মেহভাইশ নামের এক ব্যক্তি বলেন, মোদি সরকারের অধীনে গত ১২ থেকে ১৩ বছরে যে অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছেন, তা আর সহ্য করতে পারছেন না তাঁরা। তার ভাষায়, ‘এখন যদি আমাদের ভোট দেওয়ার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের আর কী থাকে?’
মানবাধিকারকর্মী ও সরকারের সমালোচকেরা অভিযোগ করে আসছেন, মোদি সরকারের এক দশকের বেশি সময়ের শাসনে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে সরকার।
নিরাপত্তা জোরদার, আটক হাজারো বিক্ষোভকারী
টানা তৃতীয় দিনের মতো সোমবার দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বসানো হয় ভারী ধাতব ব্যারিকেড। বন্ধ রাখা হয় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন।
সোমবারের মিছিলে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি সংবিধানের একটি কপি হাতে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগিয়ে গেলে বিক্ষোভকারীরা তাকে স্বাগত জানান। পরে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে রিট আবেদন করেন তিনি।
এর আগে সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ চলাকালে আয়োজকসহ হাজারো মানুষকে আটক করা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের তিনজন শীর্ষ নেতাও রয়েছেন।
বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, ব্যাপক ধরপাকড়ের মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা ও প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর সংসদ সদস্য জন ব্রিটাস অভিযোগ করেন, রোববারের বিক্ষোভের সময় পুলিশ তাকে হেনস্তা, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া এবং মারধর করেছে। তার ভাষায়, এটি শুধু একজন সংসদ সদস্যের ওপর হামলা নয়, বরং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের ওপর আঘাত।
বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকও আটক হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, পরিচয়পত্র দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের আটক করে। ডিজিটাল সাংবাদিক নীতিন কাটিয়ার ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে জানান, পুলিশ তাঁর চোখে ঘুষি মেরেছিল। আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রোববারের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলেও পুলিশ কোনো জবাব দেয়নি।
মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ
ভোটার তালিকা সংশোধনবিরোধী আন্দোলন এখন মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অধিকারকর্মীরাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনের নেতারা নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার দিল্লি পুলিশ জানায়, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জন্তর মন্তরকে আর আনুষ্ঠানিক বিক্ষোভস্থল হিসেবে নির্ধারিত রাখা হচ্ছে না। এর পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন সংগঠনটির নেতারা।
আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থল হিসেবে বন্ধ করে দিলেই প্রতিবাদ থামবে না। তার ভাষায়, ‘জন্তর মন্তর শুধু একটি জায়গা নয়, এটি প্রতিরোধের চেতনা—যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।’
এদিকে, বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান সোমবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা এবং রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যেই কংগ্রেস এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। আন্দোলন আরো বিস্তৃত হলে তা মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
সূত্র: এএফপি ও রয়টার্স