চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ২৫ ঘণ্টা ধরে তার দপ্তরেই অবরুদ্ধ রয়েছেন। গতকাল সোমবার চুয়েট ছাত্রদলের একাধিক নেতা ও কয়েকজন সাবেক ছাত্রকে নিয়ে তালা ভেঙে ২১ দিন পর দপ্তরে প্রবেশ করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা আবারও নতুন তালা দিয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে দেন।
সেই থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াইফাই সংযোগবিহীন অবস্থায় রাত পার করেছেন উপাচার্য ও তার সঙ্গীরা। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) আন্দোলনের মুখে সরে যেতে হয়েছিল। ১৮ মাস পর আবারও আন্দোলনের মুখে পড়লেন তিনিই।
জানা যায়, সোমবার সকাল ৮টায় উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। দুপুর ১২টার দিকে তাকে ভবন ছেড়ে যাওয়ার সময় বেঁধে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন না ছাড়ায় তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াইফাই সংযোগ। তবে সময়ে সময়ে খাবার ও নাশতা পাঠাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সোমবার দিনভর তাকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। বিকেলে মদুনা ঘাটসহ একাধিক স্থানে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার অভিযোগ ওঠে উপাচার্যের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে একই দিন বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধ করেন শিক্ষার্থীরা।
রাতভর পাহারা দিয়ে, খিচুড়ি খেয়ে আন্দোলন চালিয়ে নেন তারা। রাউজানের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিনু মারমা শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের অনুরোধ করলেও তারা প্রত্যাখ্যান করেন।
জানা যায়, গত বছরের এপ্রিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কুয়েটের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ ও উপ-উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে সরে যেতে হয়েছিল। চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ৫৬ দিনের মাথায় চুয়েটের ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কেন তাকে সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা দেয়নি সরকার। একই প্রজ্ঞাপনে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হলে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একযোগে তাকে প্রত্যাখ্যান করে আগের ভিসি আবু সাদাতকে বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন।
দুই পক্ষের দুই চাপ
চুয়েটে আন্দোলনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নতুন ভিসি ভিন্ন চাপ সৃষ্টি করেছেন। নিয়োগের ২১ দিন পরও ক্যাম্পাসে যেতে না পেরে প্রথমে কয়েকজন সাবেক ছাত্রকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করান উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। পরে ১০৮৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর সেপ্টেম্বরের বেতন বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে ব্যাংকে চিঠিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে সোনালী ব্যাংক ঘেরাওয়ের মধ্য দিয়ে বেতন-ভাতা আদায় করতে সক্ষম হন আন্দোলনরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা। পরে ১২ সেপ্টেম্বর চুয়েট ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে যান শেখ শরীফুল আলম। সকাল ৮টায় আনসার সদস্যকে সাধারণ শিক্ষক পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করলেও পরে ছাত্রদলের নেতাদের সহযোগিতায় তালা ভেঙে কক্ষে ঢোকেন। এরপর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে চুয়েটের পরিস্থিতি।
বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নের চাপ আন্দোলনকারীদের
উপাচার্য প্রবেশের পর তাকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে প্রথমে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা নির্ধারিত সময়ে ভবন ত্যাগ না করায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াইফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এভাবে রাতভর অন্ধকারে কাটে উপাচার্যসহ তার সঙ্গে থাকা ১১ জনের।
পাল্টাপাল্টি আবেদন আহ্বান
চুয়েটের ভিসি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পদত্যাগ প্রসঙ্গে কোনো আবেদন আসেনি। লিখিত আবেদন এলে তিনি বিবেচনা করবেন। তবে বাসে হামলায় তার হাত নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি অবরুদ্ধ ও অমানবিক অবস্থায় আছি। আমার তো হামলার প্রশ্নই আসে না। অপরদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তালা খোলার জন্য কোনো লিখিত আবেদন আসেনি। আবেদন এলে বিবেচনা করব।’
চুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হিশাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত খাবার পাঠাচ্ছি। কিন্তু কয়েকবার তিনি খাবার গ্রহণ করেননি। পরে ডিবি পুলিশের মাধ্যমে তিনি খাবার আনিয়েছেন। আমাদের দাবি মানা না হলে আন্দোলন চলবে। তালাও খোলা হবে না।