জাহিদুল আলম
রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন। পরে উদ্যানের বিভিন্ন স্থাপনা, গ্রন্থাগার ও সবুজায়ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ আবু সাঈদের বাবা, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন।
গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল শহীদদের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা, বাক্স্বাধীনতা, সুশিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে প্রায় ৮৩৪ জন শহীদের নাম সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর উদ্যানটি সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে উন্নয়নকাজে প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের প্রয়োজনে স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণও জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্মৃতিস্তম্ভ, গ্রন্থাগার ও উদ্যান রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণেরও সম্পদ। এগুলো পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের। এ সময় তিনি উদ্যানের পরিবেশ রক্ষা এবং যত্রতত্র ময়লা না ফেলার আহ্বান জানান।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান
ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার, বিএনসিসি, স্কাউট, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এডিস মশা দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা কামনা করেন।
৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভে ৮৩৪ শহীদের নাম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এবং ৯০ ফুট উঁচু। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
২৩ একর ওসমানী উদ্যানে আধুনিক নাগরিক সুবিধা
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত প্রায় ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানকে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ, নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে।
উদ্যানটিতে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানের সড়ক থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছে। এসব সুবিধা নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর বিনোদনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করছে ডিএসসিসি।
‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ গড়তে ডিএসসিসির উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ঢাকাকে ‘ক্লিন সিটি ও গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে ডিএসসিসি কাজ করছে।
তিনি জানান, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে রিসোর্স সার্কুলেশন পার্কে রূপান্তর, থ্রি-আর (3R) নীতি বাস্তবায়নে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ চালু, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং নিজস্ব নার্সারি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাগরিক সেবা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে নিয়মিত গণশুনানির পাশাপাশি ‘ক্লিন কেয়ার ডিজিটাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকেরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে এবং অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষাকালে এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া আদি ঢাকাকেন্দ্রিক নগর পর্যটন জনপ্রিয় করতে ‘হৃদয়ে ঢাকা’ ও ‘দক্ষিণের জানালা’ শীর্ষক উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, যানজট, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঢাকাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানসহ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ডিএসসিসির আশা, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান ভবিষ্যতে রাজধানীবাসীর স্মৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও নাগরিক বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।