নিজস্ব প্রতিবেদক,
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৯ (ধলপুর) কার্যালয়ে সাধারণ নাগরিকদের সেবার নামে চলছে এক জঘন্য জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ভুয়া কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন নথি পরিবর্তনের মতো অপরাধ অহরহ ঘটছে এই অফিসে। নিয়মনীতি ও সরকারি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মোটা অঙ্কের গোপন লেনদেনের মাধ্যমে বয়স কমানো থেকে শুরু করে ভিনজেলার বাসিন্দাদের ভুয়া জন্মসনদ বানিয়ে দেওয়ার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর অনুসন্ধানে এই পুরো অনিয়ম ও বাণিজ্যের মূল কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে সহকারী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক নুরুল ইসলাম-এর নাম।
সম্প্রতি জোন-৯ কার্যালয়ের এমনই এক ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের হাতে এসেছে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট এক নারী আবেদনকারীর বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ গোপন রেখে বা তোয়াক্কা না করেই জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছে। যেখানে ওই নারীর প্রকৃত বয়স থেকে এক ধাক্কায় ৮ বছর বয়স কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রামাণিক দলিল ছাড়া কীভাবে একজন মানুষের জন্মসাল এভাবে
ম্যানিপুলেট করা হলো, তা নিয়ে এখন পুরো নগর প্রশাসন ও জন্মনিবন্ধন অধিদপ্তরের ভূমিকা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে যার নামে এই জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছে, তার স্থায়ী ঠিকানা এবং জন্মস্থান স্পষ্টতই যশোর সদর উপজেলায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, নিজ এখতিয়ারভুক্ত এলাকা ছাড়া এভাবে অন্য জেলার বাসিন্দাকে সনদ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু জোন-৯ এর সিন্ডিকেট কোনো প্রকার বিদ্যুৎ বিল, ভাড়াটিয়া চুক্তি বা বৈধ কাগজপত্রের সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল অর্থের বিনিময়ে এই অবৈধ এন্ট্রি সম্পন্ন করেছে।
স্থানীয় ও সাধারণ ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জোন-৯ এর সহকারী নিবন্ধক নুরুল ইসলামই এই দপ্তরের 'সবচেয়ে বড় চোর' ও সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার হাত দিয়েই মূলত এসব ভুয়া কাগজের লেনদেন হয়। জানা গেছে, আলোচিত এই জন্মসনদটি তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সচিব হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন মোক্তার। এদিকে, তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি আক্তার গত ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি জোন-৯ থেকে বদলি হয়ে বর্তমানে অঞ্চল-৩ এ কর্মরত রয়েছেন। তবে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বা তার সময়ে কীভাবে দালাল চক্র ও নুরুল ইসলাম মিলে ওই নারী কর্মকর্তার নাম-সিল ব্যবহার করে এই সনদ ইস্যু করল- তা নিয়ে গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অল্প কিছু টাকার লোভে রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজ ম্যানিপুলেট করা এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে সরকারি সনদ ইস্যু করার এই চক্রটিকে উন্মোচন করতে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী দল মাঠে নেমেছে। এই জালিয়াতির পেছনে আর কারা কারা যুক্ত রয়েছে এবং কীভাবে ডিজিটাল সার্ভারে এই অপরাধ ঘটানো হলো, সে বিষয়ে অনুসন্ধান এখনও চলমান রয়েছে।
খুব শীঘ্রই সাংবাদিকদের এই টিমটি অনুসন্ধানী সব নথি ও প্রমাণাদিসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মহোদয় (জনাব মো: আবদুস সালাম)-এর দপ্তরে সরাসরি উপস্থিত হবেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হবে- নুরুল ইসলামের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মচারীরা কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এদের বিরুদ্ধে কী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।